নিউজ মিডীয়া কল্যাণে খবর চাউর হল, চীন বাংলাদেশ থেকে এবছর প্রচুর আম আমদানি করবে। আমি মনে মনে হাসলাম, ভাবলাম কিন্তু কেন? চায়না নিজেই প্রতিবছর ৩.৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন অর্থাৎ প্রায় ৩৮ লাখ মেট্রিক টন আম উতপাদন করে থাকে। যেখানে বাংলাদেশের প্রতি বছর টোটাল আম উৎপাদন প্রায় ২৮ লাখ মেট্রিক টন।
হ্যাঁ, আমের সিজন সমাগত। চাইনিজ বায়াররা বাংলাদেশের চাঁপাই, নওগাঁ অঞ্ছলের আম বাগানগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আম চায়নায় রফতানির কাজ জোরে সোরে আগাচ্ছে বলে টের পাওয়া যাচ্ছে। কিন্ত প্রশ্ন থেকেই গেল – নিজেরা এত বিপুল পরিমাণ আম উৎপাদন করার পরও কেন তাদেরকে আম আমদানি করতে হবে?
ওয়েল, আসুন উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।



১। চায়নায় আমের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম
চীনের আম বাজার দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে এর বাজার মূল্য ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। চীনে প্রতিবছর প্রায় ৪ মিলিয়ন টন আমের চাহিদা থাকে, কিন্তু দেশটি নিজেই ৩.৮ মিলিয়ন টন আম উৎপাদন করে। ফলে, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কিছুটা কম, যা আমদানি বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
এছাড়া চীনের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি এরও বেশি, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোক্তা গোষ্ঠীর একটি। ক্রমাগত বেড়ে চলা আমের জনপ্রিয়তা, বিশেষত তাজা আম, শুকনা আম, ও আম-ভিত্তিক পণ্য —এই বিশাল চাহিদার একটি বড় অংশ স্থানীয় উৎপাদন পূরণ করতে পারে না। তাই তাদেরকে আম আমদানি করতে হয়।
ডাটা হাইলাইসঃ
- বাংলাদেশের বার্ষিক আম উৎপাদন: ~২.৫ মিলিয়ন টন
- বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা: ~২ মিলিয়ন টন
- চীনের আমের বার্ষিক চাহিদা: ~৪ মিলিয়ন টন
- চীনের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন: ~৩.৮ মিলিয়ন টন
২. নির্দিষ্ট জাতের আমের চাহিদা চীনের কিছু অঞ্চলে
হাইনান, গুয়াংজি, ইউনান, গুয়াংডং এই কয়েকটি প্রদেশে আম উৎপাদিত হয়, তবে দেশটির বাজারে থাই ‘নাম ডক মাই’, ফিলিপাইনের ‘কারাবাও’, ভারতীয় ‘আল্পানসো’ ও বাংলাদেশের ‘হিমসাগর’ বা ‘আম্রপালির’র মতো নির্দিষ্ট জাতের চাহিদা খুব বেশি। এই বিশেষ জাতের আম চীনে ততটা উৎপাদিত হয় না, তাই আমদানি করে থাকে।
৩. আবহাওয়া জনিত সীমাবদ্ধতা – চীনে আমের মৌসুম বেশ সংক্ষিপ্ত
চায়নায় বেশিরভাগ আম মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত পাওয়া যায়। তবে চীনের বাজারে বছরের অন্যান্য সময়ও আমের চাহিদা থাকে, যা অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করে পূরণ করা হয়।
বাংলাদেশে আম থাকে মে মাস থেকে শুরু করে আগষ্ট পর্যন্ত। এখন আবার নতুন জাতের থাই কাটিমন আম প্রায় সারা বছরই উৎপাদিত হচ্ছে। সুতরাং – চায়না যদি বাংলাদেশ থেকে আম আমদানি করে তাহলে তারা বছরের একটা বিস্তৃত সময়ে তাদের ভোক্তাদের হাতে আম তুলে দিতে পারবে। সংগত কারণে চায়না বাংলাদেশ থেকে আম আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
৪. প্রসেসড আম (ড্রাই ম্যাংগো, জুস) শিল্পের চাহিদা
চীনের শুকনা আম, আম-ভিত্তিক পানীয় ও ম্যাংগো পিউরি শিল্প খুব জনপ্রিয়। স্থানীয় উৎপাদন এই পরিমাণ প্রসেসড আমের চাহিদা পূরণ করতে পারে না, তাই বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে শুকনো আম ও অন্যান্য আম-ভিত্তিক পণ্য আমদানি করা হয়।
বাংলাদেশ কি চীনের আম বাজারে প্রবেশ করতে পারে?
বাংলাদেশ সম্প্রতি চীনে হিমসাগর ও আম্রপালি আম রপ্তানি শুরু করেছে এবং এটি একটি বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র খুলে দিয়েছে। বিশেষত শুকনো আম বা ম্যাংগো পিউরি রপ্তানি বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য একটি লাভজনক ক্ষেত্র হতে পারে।
চীনের বাজারে সবচাইতে জনপ্রিয় যে আমগুলো
চীনে বেশ কয়েকটি আমের জাতের চাহিদা রয়েছে, বিশেষত উচ্চ মানের, মিষ্টি ও রসালো আম। কিছু জনপ্রিয় জাত হলো:
- নাম ডক মাই (Nam Dok Mai) – থাইল্যান্ডের এই জাতটি চীনে অত্যন্ত জনপ্রিয়, কারণ এটি মিষ্টি ও আঁশবিহীন।
- কারাবাও (Carabao) – ফিলিপাইনের বিখ্যাত জাত, যা “ম্যানিলা সুপার ম্যাংগো” নামেও পরিচিত।
- আল্পানসো (Alphonso) – ভারতের এই জাতটি সুগন্ধি ও মিষ্টতার জন্য বিখ্যাত।
- কেন্ট (Kent) – পেরুর আম, যা মিষ্টি ও কম আঁশযুক্ত।
- হাইনান আম (Hainan Mango) – চীনের নিজস্ব উৎপাদিত জাত, যা প্রধানত হাইনান প্রদেশে চাষ হয়।
- আম্রপালি ও হিমসাগর – বাংলাদেশি আম, যা ধীরে ধীরে চীনের বাজারে প্রবেশ করছে।
আপনি কি মনে করেন? আর কি কি কারণ থাকতে পারে? চিনের মার্কেটে বাংলাদেশী আম প্রবেশ করার? আমাদেরকে জানান?
সোশ্যাল মিডীয়ায় আমাদেরকে ফলো করুন।

